ভিক্টর হুগোর “লা মিজারেবল (Les Misérables)” পড়তে গিয়ে মনে হয় আমি যেন শুধু একটি উপন্যাস পড়ছি না বরং মানুষের মন, জীবন, ব্যাথা আর ভালোবাসার ওপর লেখা এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক গল্পের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। বইটি পড়তে গিয়ে একটি অনুভূতি বারবার আসে, “মানুষ আসলে জন্মগতভাবে খারাপ নয়। সমাজ, দারিদ্র্য, অবিচার, এবং শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলোই একজন মানুষকে ভালো বা খারাপ বানিয়ে দেয়।” সহানুভূতি, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভালোবাসা মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে আলোর দিকে নিয়ে যেতে পারে। একজন সাইকোলজিস্টের কাছে এই বইটি যেন মানব আচরণের একটি বিশাল মানসিক মানচিত্র।
★কেন এই বইটি সবারই পড়া উচিত?
এটি শুধু গল্প নয় বরং এটি মানুষের জীবন, মন, ভাঙন, আশা এবং ভালোবাসার এক অসাধারণ যাত্রা। এই গল্প আপনাকে মানুষের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল করে তুলবে। বইটি শেষ করলে মনে হবে আমাদের সমাজকে বদলানোর শক্তি খুব ছোট ছোট মানবিক আচরণেই লুকিয়ে আছে।
গল্পের শুরুতে আছে “জাঁ ভালজাঁ” (প্রধান চরিত্র), যে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের জন্য একটি রুটি চুরি করেছিল। এই “ছোট” অপরাধের জন্য তাকে বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হয়। এত বছরের নির্যাতন, অপমান আর অবহেলা তার মনকে শক্ত, রাগী ও অবিশ্বাসী করে তোলে। একজন সাইকোলজিস্ট হিসেবে আমি এখানে দেখি ট্রমা কীভাবে একজন ভালো মানুষকেও ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু গল্পের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি আসে তখন, যখন একজন দয়ালু বিশপ তাকে ক্ষমা করে দেন (তার বাসায় চুরি করার পরেও)। শুধু একটি ক্ষমা! অথচ এই একটি মানুষের ভালোবাসা ভালজাঁর ভেতরের অন্ধকার ভেঙে আলো দেখায়। এখানে খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় একটি মানবিক আচরণ একজনের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
গল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো “জাভের”, একজন পুলিশ অফিসার। যিনি বিশ্বাস করেন: “মানুষ বদলায় না। অপরাধী মানে অপরাধীই।” তার দৃষ্টিভঙ্গি খুব কঠোর, সাদা-কালো। একজন সাইকোলজিস্ট এখানে দেখেন rigid thinking কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। যখন জাভের ভালজাঁকে বদলে যেতে দেখেন, তখন তার ভেতরের বিশ্বাসব্যবস্থা ভেঙে যায়। সত্য ও নৈতিকতার এই সংঘর্ষ তার মনকে এমনভাবে আঘাত করে যে তিনি নিজেই নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এই দিকগুলো মানুষ কীভাবে নিজেদের কঠোর ধারণার ভেতরে আটকে পড়ে মানসিকভাবে ভেঙে যায়, তা খুব গভীরভাবে বোঝায়।
“Fantine”-এর গল্প যেন সমাজের ক্রূরতার একটি আয়না। একজন একলা মা, যে জীবনের চাপে পিষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে যায়। তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়, লজ্জা দেখানো হয়, তার সন্তানকে নিয়ে ভয় দেখানো হয়। ঠিক এভাবেই আমাদের সমাজের সামাজিক অবিচারই কত মানুষের মানসিক ভাঙনের মূল কারণ। আর তার মেয়ে “Cosette”, যে ছোটবেলায় অবহেলা, ভয় আর নির্যাতনের মধ্যে বড় হয় এখানে তার শিশু মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে। ছোট্ট Cosette এর ভয়, চুপচাপ থাকা, মানুষের উপর সন্দেহ সবই তার ট্রমার ফল। কিন্তু যখন ভালজাঁ তাকে নিজের সন্তান হিসেবে নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দেন, তখন সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। এটি দেখায় নিরাপদ সম্পর্ক মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
আমাদের আরো মানবিক হতে ভিক্টর হুগোর “লা মিজারেবল” বইটি মশাল জালানো পথিকের মতো কাজ করবে।
লেখক: মো: রাব্বি হাওলাদার
ক্লিনিক্যাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, Mindful Insights


