নীলা, বয়স ৩২। হাসিখুশি, সবার সঙ্গে মিশতে পছন্দ করে, পেশায় ব্যাংক অফিসার। কয়েক মাস ধরে তার মুখের হাসি ম্লান। খাবারের কথা ভাবলেই কাঁদে উঠে । কারণ—সে এখন আর স্বাভাবিকভাবে খেতে পারে না।
“আমার মনে হয় খাবার গলায় আটকে যায়। বুক ভার হয়ে আসে। কখনো মনে হয় শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। আমি মারা যাচ্ছি না তো?” – এই কথাগুলো বারবার বলত নীলা।
স্বামী প্রথমে তাকে নিয়ে গেলেন ENT বিশেষজ্ঞের কাছে। থ্রোট এক্স-রে, এন্ডোস্কোপি—সব কিছুই করা হলো। চিকিৎসক বললেন, “আপনার গলায় কোনো সমস্যা নেই। সব স্বাভাবিক।” তারপর গেলেন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের কাছে। সেখানেও একই কথা—“সব ঠিক আছে”।
কিন্তু নীলা জানেন, কিছু একটা তো ঠিক নেই!
প্রতিবার খেতে গেলেই বুক ধড়ফড় করে, গলায় আটকে যাওয়ার অনুভূতি হয়, পানি খাওয়ারও ভয় লাগে।
**গলার নয়, মনে আছে অসুখ**
নীলার মতো অসংখ্য মানুষ আছেন যাদের শরীর নয়, মন গলায় আটকে থাকে। এই অবস্থাকে বলে সাইকোজেনিক ডিসফেজিয়া বা গ্লোবাস ফ্যারিঞ্জিয়াস।
এটি এমন এক অবস্থা যেখানে গলায় কিছু আটকে থাকার বা খাবার গলায় আটকে যাওয়ার অনুভূতি হয়, অথচ গলার কোনো শারীরিক সমস্যা পাওয়া যায় না।
শরীর সবসময়ই আমাদের মনের ভেতরের যুদ্ধগুলো প্রকাশ করার চেষ্টা করে—কখনো পেটে ব্যথা দিয়ে, কখনো ঘাড় টেনে দিয়ে, আর কখনো… গলায় কিছু আটকে দিয়ে।
**কেন হয় এমনটা?**
নীলার গল্পে ফিরে যাই— শৈশবে তার মা ছিলেন প্রচণ্ড কঠোর। কোনোকিছু বললেই ‘চুপ করো!’ বলা হতো। আজও বড় হওয়ার পর, সে অনেক কথা বলতে চায়… কিন্তু বলতে পারে না। অফিসে মানসিক চাপ, সংসারে দায়িত্ব, নিজের না-পাওয়ার কষ্ট—সব মিলে গলার কাছে আটকে আছে।
এমন অনেক সময়, যখন আমরা কাঁদতে পারি না, বলতে পারি না, প্রকাশ করতে পারি না—তখন শরীরই দায়িত্ব নেয় জানানোর।
**গবেষণা কী বলে?**
গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০% গ্লোবাস রোগীর জীবনে রয়েছে মানসিক চাপ বা পুরনো ট্রমার ইতিহাস (Barofsky et al., 1986)। এই সমস্যা পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
অনেকে বলেন, “তোমার কিছুই তো হয়নি!” কিন্তু সেটা একদমই সঠিক নয়। এই সমস্যার নাম নেই, চিহ্ন নেই, এক্স-রেতে ধরা পড়ে না—তবুও সে সত্যি। এই কষ্ট গলার নয়, হৃদয়ের।
**কীভাবে মুক্তি মিলবে?**
সাইকোজেনিক ডিসফেজিয়া কোনো কাল্পনিক ব্যাধি নয়—এটি মনের কষ্টের একটি শারীরিক ছায়া। তাই এর চিকিৎসাও হতে হবে হৃদয়-মন-দেহের সমন্বয়ে।
নীলার মতো যারা গলায় খাবার আটকে যাওয়ার ভয়, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে ভোগেন অথচ শারীরিকভাবে সব স্বাভাবিক—তাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক, সহানুভূতিপূর্ণ এবং ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা থেরাপি।
১. সাইকো-এডুকেশন (Psychoeducation):
থেরাপির শুরুতেই রোগীকে বোঝানো হয়—এই উপসর্গ কল্পনাজনিত নয়, বরং বাস্তব এবং তার পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া। রোগী যখন জানতে পারেন তার কষ্টটিকে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে, তখন তার ভয় অনেকটাই কমে যায়।
২. কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT):
এই থেরাপিতে—
★রোগীর “আমি যদি দম বন্ধ হয়ে মরে যাই?” জাতীয় ভয়ভীতিকর চিন্তাগুলো শনাক্ত করা হয়।
★ভুল বিশ্বাসগুলো বাস্তব তথ্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।
★খাবার খাওয়ার সময় যে ভয় তৈরি হয়, সেটিকে ধীরে ধীরে মোকাবিলা করতে শেখানো হয় ।
গবেষণায় দেখা গেছে, CBT সেশন গ্রহণকারী ৮০% রোগীর উপসর্গ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় (Becker et al., 2004)।
৩. এক্সপোজার থেরাপি (Exposure Therapy):
রোগীকে ধাপে ধাপে সেই খাবারগুলোর সঙ্গে পরিচিত করানো হয় যেগুলো সে এড়িয়ে চলছিল। শুরুতে তরল খাবার → নরম → কঠিন খাবার—এইভাবে ভয় ভাঙানোর অভ্যাস গড়ে তোলা হয়।
থেরাপিস্ট পাশে থেকে রোগীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখেন।
৪. রিলাক্সেশন ও স্নায়বিক প্রশান্তি:
গলার পেশি ও নার্ভ যখন উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে, তখন শারীরিক আরাম ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যবহার করা হয়:
★Progressive Muscle Relaxation (PMR) – একে একে শরীরের পেশিগুলো চাপ ও প্রশান্তির মধ্যে আনা
★Deep Breathing Techniques – শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে ভয় নিয়ন্ত্রণ
★Mindfulness – বর্তমান মুহূর্তে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতের ভয় দূর হয়
৫. ওষুধ প্রয়োগ (প্রয়োজনে):
যদি রোগীর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ বা বিষণ্নতা থেকে থাকে, তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ SSRI জাতীয় ওষুধ (যেমন: Escitalopram) দিতে পারেন। তবে ওষুধের পাশাপাশি সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং থাকে মূল চিকিৎসা।
চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু উপসর্গ দূর করা নয়, চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো—
★রোগী যেন নিজের শরীরকে আবার বিশ্বাস করতে শেখেন
★খাওয়ার আনন্দ ফিরে পান
★মনে গেঁথে থাকা ভয় ও চাপকে ভাঙতে পারেন
কারণ, এ সমস্যা গলার নয়—এটা অপ্রকাশিত আবেগের চাপ। এবং এই চাপ কমে আসে তখনই, যখন একজন মানুষ আবার কথা বলতে পারেন, নিজের ভয়কে স্বীকার করে ফেলেন, এবং কাউকে পাশে পান।
**অন্তিমে, মুক্তি**
দশটি সেশনের পর নীলা বলে— “আমি এখন আবার খেতে পারি, এখন আর ভয় করে না। মনে হয় গলার সেই আটকে থাকা কথাগুলো আস্তে আস্তে বাইরে আসছে।”
নীলার মতো অনেকেই আছেন, যারা কাঁদতে পারেন না, বলতেও পারেন না। তারা গলা দিয়ে নয়, মন দিয়ে আটকে থাকেন।
সাইকোজেনিক ডিসফেজিয়া আমাদের শেখায়—সব অসুখ শুধু শরীরে হয় না, কিছু অসুখ মনেও হয়, শরীরের ছায়ায় দেখা দেয়।
চিকিৎসা শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজন শ্রবণ, সহানুভূতি আর কথা বলার সুযোগ।
আপনি যদি এমন কাউকে চিনে থাকেন—যে খেতে ভয় পায়, গলায় কিছু আটকে যাচ্ছে বলে বারবার অভিযোগ করেন অথচ ডাক্তার বলছেন “সব ঠিক”—তবে বুঝবেন, সেখানে মন কিছু বলতে চায়। শুধু শোনা দরকার।
Md. Rabbi Howlader
Clinical and Counseling Psychologist, Mindful Insights


